জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংসতা ও মানুষ হত্যা যেন বাংলাদেশের নিয়মিত চিত্র। জ্বালাও-পোড়াও, প্রতিপক্ষের ঘরবাড়ি, রাজনৈতিক কার্যালয় ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগ, ভোটকেন্দ্রে হামলা, ব্যালট ছিনতাই ও ডাকাতি, প্রার্থী ও সমর্থকসহ নির্বাচনী এজেন্ট এবং নিরপরাধ মানুষের ওপর হামলা ও হত্যাকাণ্ড—এসব ভয়াবহ অপরাধ নির্বাচনকালীন সময়ে নিয়মিত খবরের শিরোনাম হয়ে ওঠে।
তবে জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ এশিয়ার অন্য একটি দেশ, শ্রীলঙ্কায় সহিংসতার এমন চিত্র দেখা যায় না। গত মাসের শেষ সপ্তাহে দেশটিতে চার দশকের মধ্যে সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। অবাধ ও সুষ্ঠু এ নির্বাচনের দ্বিতীয় ধাপের লড়াইয়ে অংশ নেওয়ার আগেই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকা প্রেসিডেন্ট রনিল বিক্রমাসিংহে প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে পড়েন। দ্বিতীয় ধাপের ভোট গণনায় ছিলেন দেশটির রাজনীতির আরেক শক্তিশালী ব্যক্তি সাবেক প্রেসিডেন্ট রানাসিংহে প্রেমাদাসার বিদেশে পড়াশোনা করা সুযোগ্য সন্তান সাজিথ প্রেমাদাসা।
শ্রীলঙ্কার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে প্রভাবশালী দুটি রাজনৈতিক পরিবারকে পেছনে ফেলে নতুন কান্ডারি হিসেবে রাজনীতিতে আসেন অনূঢ়া কুমারা দিসানায়েকে। এখানে সহিংসতা, হানাহানি বা জ্বালাও-পোড়াও ছাড়াই রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটেছে। কিন্তু কীভাবে এটি সম্ভব হলো? শ্রীলঙ্কা ইউরোপ-আমেরিকার উন্নত দেশগুলো যেমন সুইজারল্যান্ড, জার্মানি, কানাডার মতো নয়। গড় মাথাপিছু আয়, মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) এবং মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণের বোঝা—এ সব দিক থেকে তারা আমাদের দেশের তুলনায় কিছুটা পিছিয়ে। তবুও তারা কেন এমন একটি প্রশ্নাতীত নির্বাচন পরিচালনা করতে সক্ষম হলো?
শ্রীলঙ্কার নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট অনুযায়ী, প্রত্যেক ভোটার সর্বোচ্চ তিনজন প্রার্থীকে পছন্দের ক্রম অনুযায়ী ভোট দিতে পারেন। যার সবচেয়ে বেশি পছন্দ হয়, তার নাম বা প্রতীকের পাশে ‘১’, এরপর দ্বিতীয় পছন্দের প্রার্থীর পাশে ‘২’ এবং তৃতীয় পছন্দের পাশে ‘৩’ লিখতে পারেন। এই পছন্দের মাত্রার ভিত্তিতে ওই তিন প্রার্থীর ভোটের শতাংশ হিসেবে ভাগ হয়ে যায়। এটি মূলত ‘ইস্প্লিটিং ভোট’-এর মতো, যা বিভিন্ন উন্নত দেশে প্রচলিত রয়েছে।
যেখানে একজন ভোটার শতাংশের হিসেবে একাধিক প্রার্থীকে সমর্থন জানাতে পারেন। উদাহরণস্বরূপ, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী ৫ প্রার্থীর মধ্যে তার পছন্দ অনুযায়ী তিনি দুই, তিন বা পাঁচজনকেই ভোট দিতে পারেন। এতে ভোটারের ১০০ শতাংশ ভোট ভাগ হয়ে যায় দুই, তিন কিংবা পাঁচ প্রার্থীর মধ্যে শতাংশের আকারে। যেমন, একজন প্রার্থী পেতে পারেন ৫০ শতাংশ, দ্বিতীয় পছন্দের প্রার্থী ৩০ শতাংশ এবং তৃতীয় প্রার্থী ২০ শতাংশ।
এই ভোটদান পদ্ধতিই নির্বাচনী সহিংসতা রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

0 মন্তব্যসমূহ